নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় শিক্ষক ও সহপাঠীসহ ৩০ জনের সাক্ষ্য

রাফি হত্যার ঘটনায় সোমবার টানা ৭ ঘণ্টা শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীসহ অন্তত ৩০ জনের লিখিত সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্ত টিম। এ সময় রাফিকে আগুনে পোড়ানোর পরের মর্মস্পর্শী বর্ণনা দেন সাক্ষীরা।এদিন বেলা ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অফিস কক্ষে বসে পিবিআই কর্মকর্তারা তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক মো. শাহ আলম যুগান্তরকে বলেন, রাফি হত্যার ঘটনা তদন্তে ও দ্রুত চার্জশিট দেয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে পিবিআই। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মাদ্রাসার কেন্দ্র সচিব মাওলানা নূরুল আফছার ফারুকী, অধ্যক্ষ মাওলানা মোহাম্মদ হোসাইন, পৌর কাউন্সিলর শেখ আবদুল হালিম মামুন, মাদ্রাসার কর্মচারী নুরুল আমিন, রাফির সহপাঠী নিশাত ও ফুর্তিসহ অন্তত ৩০ জনের কাছ থেকে মৌখিক ও লিখিত সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে।
পিবিআইয়ের চট্টগ্রাম বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. মনিরুজ্জামান বলেন, রাফি হত্যা মামলা তদন্তে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীর লিখিত সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে।এর আগে মাদ্রাসার কেন্দ্র সচিব মাওলানা নুরুল আফছার ফারুকী বলেন, রাফি হত্যাকাণ্ড ও সিরাজ উদ্দৌলা সম্পর্কে মৌখিক ও লিখিতভাবে সাক্ষ্য নিয়েছে পিবিআই। ঘটনার দিন পরীক্ষা কেন্দ্রে থাকা বেশ কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর কাছ থেকে সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে।সাক্ষ্য নেয়ার আগে চট্টগ্রাম বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মঈন উদ্দিন ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. শাহ আলমসহ তদন্ত দলের কর্মকর্তারা রাফি হত্যার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
এদিকে সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের কাছ থেকে জব্দ করা দুটি মোবাইল সেটের ডিজিটাল ময়নাতদন্ত চলছে পিবিআইয়ের ল্যাবে। এর ফরেনসিক রিপোর্ট সোমবার পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় তা পাওয়া যায়নি। ফলে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার যৌন হয়রানির পর রাফির জবানবন্দি ভিডিও করে ছড়ানোর ঘটনায় ওসির বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আজ আদালতে (ধার্য করা দিন) জমা দিতে পারছে না পিবিআই।এ জন্য মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আরও ৩০ দিন সময় চেয়ে সোমবার আদালতে আবেদন করেছেন। তবে পিবিআই সূত্র জানিয়েছে, ফরেনসিক প্রতিবেদন পাওয়ার পর তদন্ত প্রতিবেদন আগামী সপ্তাহেই পাওয়া যেতে পারে। এরপর যত দ্রুত সম্ভব মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেয়া হবে। স্পর্শকাতর এ মামলাটির তদন্ত সূক্ষ্ম ও নিরপেক্ষভাবে হচ্ছে দাবি করে পিবিআই বলেছে, শুধু ওসি কেন ভিডিও ছড়ানোর ঘটনার সঙ্গে যাদের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিলবে- কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। যারা ভিডিওটি ছড়িয়েছেন, যারা শেয়ার করেছেন তাদেরও চিহ্নিত করা হবে।
যদি কোনো কারণে ফরেনসিক রিপোর্টে ওসির মোবাইল সেট থেকে ভিডিওর প্রমাণ না মিলে তবে প্রয়োজনে আলামত পাঠানো হবে সিআইডির ফরেনসিক ল্যাব কিংবা অন্য কোনো সংস্থার ল্যাবে। একাধিক এক্সপার্টকে দিয়ে মতামত নেয়া হবে। ওসির বিরুদ্ধে এ মামলার তদন্ত যাতে কোনো ধরনের সমালোচনার মুখে না পড়ে সেদিকেও বিশেষ নজর রেখে তদন্তকাজ চালিয়ে যাচ্ছে পিবিআই।অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার যৌন হয়রানির ঘটনার পর যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে ভুক্তভোগীকে জিজ্ঞাসাবাদ, ভিডিও ধারণ ও ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ এনে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করেন ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন। আদালত মামলাটি তদন্ত করে ৩০ এপ্রিলের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন পিবিআইকে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের এএসপি রীমা সুলতানা যুগান্তরকে বলেন, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত চলছে। ফরেনসিক রিপোর্ট না পাওয়ায় আদালতের কাছে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আরও সময় চাওয়া হয়েছে।অন্যদিকে রাফি হত্যার ঘটনায় স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে পুলিশ সদর দফতর থেকে গঠিত কমিটি তাদের তদন্ত প্রতিবেদন লেখার কাজ শুরু করেছে। পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তদন্ত কমিটির এ প্রতিবেদন জমা দিতে আরও অন্তত ৩ দিন সময় লাগতে পারে।
প্রসঙ্গত, ৬ এপ্রিল সকালে আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় যান নুসরাত জাহান রাফি। কয়েকজন তাকে কৌশলে ছাদে ডেকে নিয়ে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে করা শ্লীলতাহানির মামলা তুলে নিতে চাপ দেয়। অস্বীকৃতি জানালে কেরোসিন ঢেলে তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। এ ঘটনায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা, পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলমসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন রাফির বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান। ১০ এপ্রিল রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যান অগ্নিদগ্ধ রাফি। এর আগে ২৭ মার্চ ওই ছাত্রীকে নিজ কক্ষে নিয়ে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরদিন তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রোববার তাকে আদালতে হাজির করা হয়। এ পর্যন্ত রাফি হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার ২২ জনের মধ্যে সিরাজ উদ্দৌলাসহ ৯ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।সোনাগাজীতে মানববন্ধন : রাফিকে হত্যার প্রতিবাদে সোমবার সকালে সোনাগাজীর চরমজলিশপুর ইউনিয়নের বিষ্ণুপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনের সড়কে মানববন্ধন করেছে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। মানববন্ধনে রাফির হত্যাকারী ও পরিকল্পনাকারী সিরাজ উদ্দৌলাসহ সব আসামির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি জানানো হয়।
শিক্ষার্থী জোটের রোডমার্চ আজ : রাফি হত্যাকাণ্ডে সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনসহ সব অপরাধীর গ্রেফতার ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবিতে আজ ঢাকা থেকে রওনা হয়ে সোনাগাজী পর্যন্ত রোডমার্চ করবে যৌন নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থী জোটের ৫০ সদস্যের একটি দল। সকাল ৭টায় শাহবাগ থেকে যাত্রা করে সোনাগাজী জিরো পয়েন্ট, সোনাগাজী বালিকা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, সোনাগাজী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, রাফির বাড়ি ও কবরস্থান সংলগ্ন আল হেলাল একাডেমি বিদ্যালয়ের সামনে সমাবেশ করবে। এরপর ফেনী ও কুমিল্লার চান্দিনায় পথসভা করবে এ শিক্ষার্থী জোট। সোমবার যৌন নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থী জোটের বিবৃতিতে এ তথ্য জানা গেছে।
No comments
If you have any doubt, please let me know that with your valuable comments.