‘পশ্চিমবঙ্গ’র নাম ‘বাংলা’ করার সম্ভাব্য বিপদ
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নাম পাল্টে ‘বাংলা’ করার প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত। নাম পাল্টানোর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে ‘পশ্চিমবঙ্গ’ নামটি ইংরেজিতে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল’; আর ডব্লিউ অক্ষরটি ইংরেজি বর্ণমালার শেষের দিকে। তাই যে কোনো সভা সেমিনার কিংবা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ইত্যাদিতে পশ্চিমবঙ্গের সিরিয়ালটি পড়ে শেষের দিকে। তাই, ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ (আসনসংখ্যা ৪২) সংসদীয় আসনসম্পন্ন রাজ্য (মহারাষ্ট্র ৪৮, আর উত্তর প্রদেশের আসন সংখ্যা ৮০) হিসেবে তাদের নানা ধরনের অসুবিধা হয়।
নাম পাল্টানোর দাবির পক্ষে এই কারণ কিছুটা যুক্তিযুক্ত মনে হলেও ‘বাংলা’ নামটি রাখা নিয়ে এই লেখকের রয়েছে ভিন্নমত। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সর্বতোভাবে সহায়তাকারী বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী দেশটির এই নামকরণ নিয়ে আমার শঙ্কার কারণ হল- বাংলাদেশের সঙ্গে নামটির রয়েছে অবিচ্ছেদ্য মিল। এই মিলের কারণে দুটি দেশের মধ্যে নানা ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। কারণ ‘বাংলা’ আর ‘বাংলাদেশ’- এই দুটি শব্দই আসলে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করে, পশ্চিমবঙ্গকে না। এই শব্দটি দ্বারা আসলে বাংলাদেশকেই বোঝায় (‘আমার দুঃখিনী বাংলা’); আর বোঝায় বাংলা ভাষাকে (‘আ-মরি বাংলা ভাষা’)। যুগ যুগ ধরে এভাবে ব্যবহারের ফলে ‘বাংলাদেশ’-এর সঙ্গেই শব্দটি সবচেয়ে মানিয়ে গেছে। পৃথিবীর আর কোনো কিছুর সঙ্গেই ‘বাংলা’ শব্দটি এতটা মানানসই হতে পারে না।
বাংলাদেশ নামটির সঙ্গে এবং রক্তের বিনিময়ে অর্জিত পৃথিবীর একমাত্র ভাষা বাংলার সঙ্গে সদ্য ধারণকৃত পশ্চিমবঙ্গের ‘বাংলা’ নামটির এই মিল ধ্বনিগতই হোক আর বর্ণগতই হোক, বিশ্বের অন্যান্য দেশের কাছেও তা সামান্যতম হলেও খটকা সৃষ্টি করতে পারে। তাছাড়া ‘বাংলা’ নামটি যেহেতু পৃথিবীর ৮ নম্বর ভাষার নাম, সে কারণেও তো ভারতের একটি রাজ্যের নাম হুবহু একই না রেখে একটু এদিক-সেদিক করে রাখা যেত।
কথার পৃষ্ঠে যদি বলি- ভারতের প্রধান ভাষা ‘হিন্দি’, তারা কি যে কোনো প্রয়োজনে ভারতের একটি রাজ্যের নাম ‘হিন্দি’ রাখবে? নিশ্চয়ই না। সে কারণে ‘বাংলা’ যেহেতু পৃথিবীর একটি উল্লেখযোগ্য ভাষার নাম, আবার ভারতের প্রতিবেশী একটি বন্ধুপ্রতিম দেশের নামও (বাংলাদেশ); তাই এই নামকরণ যৌক্তিক হবে না বলে মনে করি। কারণ, এতে করে দুই দেশের মধ্যেই ভেতরে ভেতরে, অনেক মানুষের ভেতরে নানা ধরনের প্রশ্নেরও সৃষ্টি হতে পারে। শুধু তাই নয়, সৃষ্টি হতে পারে দু’দেশের বন্ধুত্বে দূরত্ব। সংকট-দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সূচনা হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো বিশ্ববিখ্যাত নোবেলজয়ী সাহিত্যিকের জন্মভূমি ভারতের মতো একটি দেশের তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জির মতো দেশপ্রেমিক রাজনীতিকদের মাথায় না এলেও সে দেশের কবি-সাহিত্যিকদের মাথায় তো নিশ্চয়ই একটি যুতসই/অধিক মানানসই নাম, প্রস্তাব আকারে আসতেই পারত। একটি সুন্দর ও সর্বজনগৃহীত নামের কি এতই আকাল পড়ল দেশটিতে!
সর্বজনগৃহীত বললাম এ কারণে যে, খোদ ভারতেও এই নামের যৌক্তিক বিরোধিতা আছে (অনলাইন নিউজলেটার ‘বঙ্গসাহিত্য’-প্রকাশিত বিকাশ মাহাতার লেখাটি এ ক্ষেত্রে স্মর্তব্য)। একটি ভাষার নামে নতুন করে একটি রাজ্যের নামকরণ আমার কাছে নান্দনিকতাবোধসম্পন্ন মনে হয় না। সৃজনশীলতার সাক্ষরও তাতে পাওয়া যায় না।
পশ্চিমবঙ্গ কিংবা পুরো ভারতেই কি একজনও এমন সাহিত্যিক নেই যিনি সবকূল বজায় রেখে পশ্চিমবঙ্গের একটি সুন্দর নাম দিতে পারেন? আমি বিশ্বাস করি, আছে। যার প্রমাণ ভারতের সাহিত্য একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত দুই বাংলার জনপ্রিয় লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের প্রস্তাবিত ‘বঙ্গভূমি’ নামটি। এ নামটি ‘বাংলা’ নামটির চেয়ে বিভিন্ন দিক থেকে যৌক্তিক মনে হয়েছে।
জেনেছি, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যটি সৃষ্টির প্রাক্কালেই এর নাম ছিল ‘বঙ্গভূমি’। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় এর নাম করা হয় পশ্চিমবঙ্গ। ‘বঙ্গভূমি’ নামটি রাখলে অন্তত এটি তার আদিনাম বা প্রকৃত নামেরই কাছাকাছি হয়। তাছাড়া, যে উদ্দেশ্যে নাম পরিবর্তন; তাও পূরণ হবে।
নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবনায় ‘বাংলা’ নামটিকে তিন ভাষায় তিন নামে ব্যবহারের প্রস্তাবটিও অনান্দনিক (যদিও, পুরোটাই তাদের বিষয়)। এই প্রস্তাবে বলা হয়েছে ‘বাংলা’ নামটি হিন্দিতে বলা হবে ‘বাঙ্গাল’ আর ইংরেজিতে ‘বেঙ্গল’!
আজকের বিশ্বে এমন আধুনিকতাবর্জিত প্রাচীন প্রচলিত ধারণার পুনরাবৃত্তির কোনো মানেই হয় না। একটি নামই পৃথিবীর সব ভাষায় উচ্চারিত ও লিখিত হতে পারে, যেমন হয় ‘বাংলাদেশ’, ‘সুইডেন’, ‘ডেনমার্ক’, ‘জাপান’, ‘সিঙ্গাপুর’ ইত্যাদির ক্ষেত্রে (যদিও ভারতকে তিন নামে চেনা যায় যথা- ‘ভারত’, ‘ইন্ডিয়া’ ও ‘হিন্দুস্থান’)।
ভারতে উত্তর প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, ত্রিপুরা, তামিলনাড়ু (সংসদীয় আসন সংখ্যা ৩৯), পাঞ্জাব, মহারাষ্ট্র্র নামের রাজ্যগুলোও তো আছে। হয়তো সবার আসন সংখ্যা পশ্চিমবঙ্গের মতো বেশি না। কিন্তু উত্তর প্রদেশের আসন সংখ্যা তো-৮০ (পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে ৩৮টি বেশি)। তাহলে কি উত্তর প্রদেশের নামও বদলানো
হবে? আদ্যাক্ষর বিচারে বর্ণমালার শেষের দিকে অবস্থানকারী উল্লিখিত অন্য রাজ্যগুলোর নামও কি তাহলে পাল্টানো হবে?
ব্যবসা ক্ষেত্রে বিখ্যাত ব্র্যান্ডের কোনো আইটেমের নামানুকরণ অথবা নকল করা হয় সাধারণ ক্রেতাদের ছদ্মবেশে ফাঁকি দিতে বা ঠকাতে। আমাদের দেশে ‘বাটা’ কোম্পানি সুপরিচিত ব্র্যান্ড, মানুষ কেনে বেশি। তাই এই নামের সঙ্গে ধ্বনিগত মিল রেখে, ‘বাটা’ লেখা লোগোটির স্টাইল হুবহু একই রেখে ‘রাটা’ হাওয়াই চপ্পল সিল মেরে বাজারে চালানো হয়।
সরলমনা ক্রেতারা ‘বাটা’ মনে করে ফুটপাত থেকে খানিকটা কম দামে এই স্যান্ডেল কেনেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের নামকরণে বাংলা (বাংলাদেশ)-এর সঙ্গে হুবহু মিলের ব্যবসায়িক রহস্যটি আমি বুঝতে পারি না। এর অন্তর্নিহিত কারণটিও আমার কাছে এখনও অস্পষ্ট!
আমাদের জাতীয় সঙ্গীত নিয়েও দুটি দেশের মধ্যে সংকটের সৃষ্টি হতে পারে। কারণ এর রচয়িতাও ভারতের, আবার ভারতেরই একটি রাজ্যের নাম (‘বাংলা’) দিয়েই এর শুরু (‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি...’)। অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ রাখা হলে সেখানকার মানুষ যদি আমাদের জাতীয় সঙ্গীতকে ওদের রাজ্যসঙ্গীত হিসেবে গাওয়া শুরু করে, তাতে আমাদের কিই বা বলার থাকবে!
সেরকম হলে, আগামীতে আমাদের জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তনের প্রস্তাব উত্থাপিত হওয়ার সম্ভাবনাকেও কি উড়িয়ে দেয়া যায়? তাই আমার মতে, পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ না রাখাই উচিত।
ভারত বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ বিশ্বস্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রতিবেশী রাষ্ট্র। মোদি সরকারের আমলে দুই দেশের সম্পর্ক একটা ঐতিহাসিক, ভিন্ন মাত্রায় পৌঁছেছে। তার ওপর, মুক্তিযুদ্ধকালীন আমাদের শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে ভারত আমাদের চির কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করে রেখেছে। সেই কৃতজ্ঞতাবোধ আর সহমর্মিতার অধিকারেই পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে আমার প্রস্তাবটি পুনর্বিবেচনার জন্য বিনীত অনুরোধসহ বলছি- ‘প্রিয় শ্রদ্ধেয় মমতাদি, পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ রাখার বদলে যেসব নাম রাখা যেতে পারে : (সব ভাষায়ই ব্যবহার হবে যে কোনো একটি নাম) ‘বঙ্গ’, ‘বঙ্গরাজ্য’, ‘বঙ্গপুর’, ‘বঙ্গস্থান’, ‘বঙ্গমাটি’ অথবা ‘বঙ্গভূমি (শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় প্রদত্ত)। আশা করি, এতে সব কূলই রক্ষা হবে।
আশাফা সেলিম : ছড়াকার ও সংস্কৃতিকর্মী
Bangladeshi Taka Converter
No comments
If you have any doubt, please let me know that with your valuable comments.